মহান মে দিবস : শ্রমিক অধিকার ও সংগ্রামের রুদ্রপথ।
![]() |
| ছবি: শাহানা সিরাজী |
বিশ্বের যতো নন্দিত বিলাস সবই শ্রমিকের রক্তে আর ঘামে ভেজা। যতো উঁচু দালান আর সৌখিন যাপন সবই শ্রমিকের ঘাম-শ্রম। বিনিময়ে কী পায়? না সম্মান, না জীবন, না অর্থ প্রতিপত্তি!
শ্রমিক রান্না করে, চেয়ার সাজায়, প্লেট সাজায়। কিন্তু সে চেয়ারে সে প্লেটে তারা খেতে পায় না। শ্রমিক প্রাসাদ গড়ে সে প্রাসাদে যারা থাকে তাদের সামনে শ্রমিক নতজানু! বার বার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অথচ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার কথা কার?
দুনিয়া জুড়ে আমরা কী শ্রমিক নয়? আমরা যে যেখানেই কাজ করছি আমাদের ইচ্ছা, আমাদের মনোবল, আমাদের, চেতনা সবই কী বাঁধা নয়? আমাদের জীবন যাপনের মান উন্নত হয় না, আমরা একই সাথে চেয়ারে বসতে পারি না। একের ওপর অপর আধিপত্য বিস্তারই তো মনুষত্ব্যের অপমৃত্যু!
অতীতে যেমন মানুষ বিক্রি হতো, ক্রীতদাস ছিলো, এখনো তাই। শুধু ক্রীতদাসের ফরমেট ভিন্ন। ক্রীতদাস যেমন মালিকের হুকুম ছাড়া ঘর থেকেই বের হতে পারে না তেমনি এখন মানুষ নানান বিধিমালায় নিজের প্রাণকে ওষ্ঠাগত করে ফেলে। দুটোই দাসত্ব! পার্থক্য কোথায়? কেন কারো কাছে হাজার কোটি টাকা কারো কাছে কেবল নিজের বাহুবল? এহেন ন্যাক্কারজনক অবস্থা নিয়ে মানুষ কখনো ভাবে? প্রতিটি নিঃশ্বাস যেখানে শেষ নিঃশ্বাস, সেখানে মানুষের অহংকারই যেন প্রবল। প্রভুত্বই তার প্রধান বৈশিষ্ট্য। কেউ প্রভু কেউ অধিনস্ত। অধিনস্তদের কাঁধে পা রেখে প্রভুরা সম্মান, কৃতিত্ব অর্জন করে।
প্রভুদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য শ্রমিকেরা ধীরে ধীরে সংঘটিত হয়। তা ব্রাস্ট হয় পহেলা মে ১৮৮৬ সালে, আমেরিকার শিকাগো শহরে।
সেদিনও শ্রমিকদের ওপর গুলি করা হয়, বাকিদের হত্যা করা হয়, বিচারের নামে ফাঁসি দেয়া হয়। কিন্তু সেই আত্মত্যাগ কালের প্রবাহে শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সিঁড়ি হয়ে ওঠে। সারাবিশ্ব এ দিনটিকে স্মরণ করে।
মিছিল- মিটিং হয়। সেমিনার -সিম্পোজিয়াম হয়।
এতে মানুষের ভেতর সচেতনতা সৃষ্টি হয়।নিজেদের অধিকার আদায়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। এটাই শ্রমিক দিবসের মূল লক্ষ্য।
পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যে মানুষের ডেজিংনেশান শ্রমিক-প্রভু।
অথচ সবারই জন্ম একই ভাবে শুক্রাণু ডিম্বানুর নিষিক্তের মাধ্যমে মাতৃজঠরে একই ভাবে বেড়ে ওঠে।
জন্মের পরই কেউ শ্রমিক কেউ মালিক! আজ শ্রমিক দিবসে এ দুটো শব্দের প্রতি নিন্দা জানালাম।
এ দুটো শব্দই তাবৎ মানুষকে বিভক্ত করেছে।
১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ। সেই সময় শ্রমিকদের অমানবিক পরিবেশে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। এর প্রতিবাদে এবং "আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা বিনোদনের" দাবিতে শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করেন। ৪ঠা মে হে মার্কেটে শ্রমিকদের সমাবেশে পুলিশ গুলি চালালে বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিহত হন এবং অসংখ্য আহত হন। পরবর্তীকালে এই আন্দোলনের নেতাদের ফাঁসি ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়। শ্রমিকদের এই মহান আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত 'দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে' ১লা মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মে দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য:
মে দিবসের মূল তাৎপর্য হলো শ্রমিক ও মালিকের মধ্যবর্তী বৈষম্য কমিয়ে আনা। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শ্রমিকরাই সভ্যতার মূল কারিগর।
শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত করা একটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও কাজের উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের শক্তি অপরিসীম।
বাংলাদেশে মে দিবস অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হয়। আমাদের দেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্প ও প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে আজও অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য মজুরি ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, শিশুশ্রম এবং নারী শ্রমিকদের বেতন বৈষম্যের মতো সমস্যাগুলো এখনো বিদ্যমান। মে দিবসের অঙ্গীকার হওয়া উচিত— বাংলাদেশের প্রতিটি শ্রমিকের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল এবং বাঁচার মতো মজুরি নিশ্চিত করা।
শ্রমিকদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে আট ঘণ্টা কর্মদিবস স্বীকৃত। কিন্তু লড়াই এখনো শেষ হয়নি। আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তি ও অর্থনীতির পরিবর্তনের সাথে সাথে শ্রমিকের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসছে। মে দিবসের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের উচিত শ্রমের মর্যাদা দেওয়া এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করা হবে। এখনো প্রভুত্ব -দাসত্ব মনোভাব ঘুচেনি, এখনো প্রভাত অনেক দূর!
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কর্মজীবী, পেশাজীবী মানুষদের সম্মান যথার্থ ভাবে দেয়াই হোক এ দিবসের মূল লক্ষ্য।
"দুনিয়ার মজদুর, এক হও!"
✍️শাহানা সিরাজী
ইন্সট্রাক্টর (সাধারণ)
পিটিআই, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
কবি, প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক

0 মন্তব্যসমূহ